Advertisement
শনিবার, 17 অক্টোবর 2026
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ

শেরপুরে রেললাইন: প্রতিশ্রুতির এক যুগ, ট্রেনের হুইসেল কবে?

শেরপুরে রেললাইন: প্রতিশ্রুতির এক যুগ, ট্রেনের হুইসেল কবে?
News Banner

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন রেল যোগাযোগের বিস্তার ঘটছে, তখনও রেলবঞ্চিত জেলার তালিকায় রয়ে গেছে সীমান্তবর্তী শেরপুর। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ জেলার মানুষের কাছে রেললাইন এখনো বাস্তবতার চেয়ে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ। ২০১৪ সালে রেললাইন নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হলেও এক যুগের বেশি সময় পরও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

ময়মনসিংহ থেকে শেরপুর, শ্রীবরদী, বকশীগঞ্জ হয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। এ দাবিতে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ, মিছিল, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন স্থানীয়রা। সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এ দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন।

প্রস্তাবিত রেলপথটি বাস্তবায়িত হলে শুধু শেরপুর নয়, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও কুড়িগ্রামের কয়েকটি উপজেলার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সহজ হবে যাতায়াত। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ পাবেন তুলনামূলক কম খরচে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যোগাযোগের সুযোগ।

প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি

২০১৪ সালে শেরপুরে রেললাইন নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। এর মধ্যে সমীক্ষা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

সম্প্রতি সরকার শেরপুরসহ দেশের ১০টি জেলাকে পর্যায়ক্রমে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে। এতে নতুন করে আশার আলো দেখছেন শেরপুরবাসী। তবে আগের অভিজ্ঞতার কারণে এবার শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চান তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—আর কত প্রতিশ্রুতি ও কত বছর অপেক্ষার পর শেরপুরে শোনা যাবে ট্রেনের হুইসেল?

কৃষিপণ্যের বাজার বাড়বে

শেরপুর ও জামালপুরের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, আখ, তামাক, সরিষা, ডাল, চীনাবাদাম, ডিম, চামড়া, পান ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয় এ অঞ্চলে।

রেল যোগাযোগ চালু হলে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কম খরচে ও দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

স্থলবন্দর ঘিরে নতুন সম্ভাবনা

শেরপুরের নাকুগাঁও, জামালপুরের ধানুয়া কামালপুর এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী স্থলবন্দরকে ঘিরেও রেল যোগাযোগের গুরুত্ব রয়েছে। রেলপথ যুক্ত হলে সীমান্ত বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আমদানি-রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসতে পারে। পাশাপাশি এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রেল যোগাযোগ বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পর্যটনেও খুলবে নতুন দুয়ার

শেরপুরের গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক, সীমান্তবর্তী পাহাড় ও বনাঞ্চল দেশের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। তবে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হয়নি স্থানীয় পর্যটন।

রেল যোগাযোগ চালু হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের শেরপুরে আসা সহজ হবে। এতে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।

সড়কনির্ভর যোগাযোগে শেরপুর

শেরপুর এমন একটি জেলা, যার আন্তঃজেলা যোগাযোগব্যবস্থা মূলত সড়কনির্ভর। রেল, নৌ কিংবা বিমান—কোনো ধরনের বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা নেই। ফলে দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে এ জেলার মানুষকে সড়কপথের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

অথচ রেল শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; একটি রেললাইন একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

কোন পথে হবে রেললাইন?

প্রস্তাবিত রেলপথের রুট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি—ময়মনসিংহ-শেরপুর-শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ হয়ে রৌমারী ও রাজিবপুর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা।

তাঁদের মতে, এই রুট বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে নতুন একটি যোগাযোগ করিডর তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের সরাসরি যোগাযোগ সুবিধা বাড়বে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

এবার কাজ চান শেরপুরবাসী

শেরপুরবাসীর প্রত্যাশা এখন আর নতুন কোনো ঘোষণা নয়। তাঁরা চান প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ, টেন্ডার আহ্বান, নির্মাণকাজের সূচনা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ। কারণ শুধু ঘোষণায় উন্নয়ন আসে না, উন্নয়ন দৃশ্যমান হয় বাস্তবায়নে।

ময়মনসিংহ-শেরপুর-শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ-রৌমারী-রাজিবপুর রেললাইন তাই শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি জনদাবি। রেল যোগাযোগ চালু হলে বদলে যেতে পারে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি, বাণিজ্য, পর্যটন ও শিল্পের চিত্র।

এখন শেরপুরবাসীর অপেক্ষা—প্রতিশ্রুতির রেললাইন কবে বাস্তবের রেললাইনে রূপ নেবে, আর কবে শোনা যাবে সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের হুইসেল?

এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 80 বার

নিউজ ডেস্ক

স্টাফ রিপোর্টার

এই সাংবাদিকের মোট খবর: 456 টি

মন্তব্য করুন